নতুন বিনিয়োগ নেই, চাকরিও হারাচ্ছেন অনেকে

মূলধনি যন্ত্রপাতির ঋণপত্র খোলা কমেছে ৩০ শতাংশ

টানা তিন অর্থবছর ধরে দেশে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমছে। চলতি অর্থবছরেও এ খাতের ঋণপত্র (এলসি) হ্রাসের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।

টানা তিন অর্থবছর ধরে দেশে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমছে। চলতি অর্থবছরেও এ খাতের ঋণপত্র (এলসি) হ্রাসের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। তিন বছর আগে এক অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি খোলার পরিমাণ ছিল ৬০০ কোটি বা ৬ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরে তা মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য মাত্র ১১৫ কোটি ৩৯ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। যেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ২৪ শতাংশ কমে যাওয়ার পরও এ আট মাসে ১৬৫ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি আরো ৩০ দশমিক ১০ শতাংশ কমে গিয়েছে। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি কমেছিল ২৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

ব্যাংক নির্বাহী ও উদ্যোক্তারা বলছেন, যেকোনো শিল্প স্থাপনের মূলে রয়েছে মূলধনি যন্ত্রপাতি। বাংলাদেশের শিল্প খাতের মূলধনি যন্ত্রপাতির বড় অংশই আমদানিনির্ভর। যন্ত্রপাতি আমদানি করেই উদ্যোক্তারা নতুন কারখানা স্থাপন করেন। এর মাধ্যমে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। কিন্তু টানা তিন বছর ধরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমছে। তার মানে দেশে নতুন শিল্প স্থাপন বা কর্মসংস্থান বিকাশের পথ ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হচ্ছে।

দেশে নতুন বিনিয়োগের যে খরা চলছে, সেটি বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও ফুটে উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ অর্জন হয়েছে। যদিও মুদ্রানীতিতে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির হার যেখানে নেমেছে, সেটি গত ২১ বছরের সর্বনিম্ন। সর্বশেষ ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮২ শতাংশের নিচে নেমেছিল।

মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি এতটা কমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য ভালো কোনো খবর নয় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এ সম্মাননীয় ফেলো বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেকোনো শিল্প স্থাপনের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি দরকার হয়। আর বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা এ ধরনের যন্ত্রপাতি আমদানি করেন। কয়েক বছর ধরেই মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমছে। আমদানি কমে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির হারও ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বিকাশের জন্য এগুলো সুখকর কোনো সংবাদ নয়।’

এ পরিস্থিতি নিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান আরো বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস আন্দোলন, অভ্যুত্থানসহ নানা বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে পার হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে বিনিয়োগ ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়াটি অস্বাভাবিক নয়। তবে আশার কথা হলো, এখন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণে ডলার সংকট কেটে যাচ্ছে। আমদানি নীতিও উদার করা হয়েছে। চলতি বছরের বাকি সময়ে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, করোনাভাইরাস-সৃষ্ট দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার বছর, অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানির জন্য দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ এলসি খোলা হয়। ওই অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ হাজার ৯১৬ কোটি বা ৮৯ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। এক অর্থবছরে এত পরিমাণ আমদানির ভার নিতে পারেনি বাংলাদেশ। এতে দেশে তীব্র ডলার সংকট সৃষ্টি হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে বলেছে, ওই অর্থবছরে আমদানির আড়ালে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও অলিগার্করা এক অর্থবছরেই আমদানির আড়ালে দেশ থেকে অন্তত ২০ বিলিয়ন ডলার পাচার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২১-২২ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি দেখানো হয় ৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এর পর থেকে দেশের সামগ্রিক আমদানি কমে আসার পাশাপাশি মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিও কমে যায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতের এলসি খোলা কমে ৫৫ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। আর এলসি নিষ্পত্তিও ২৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে আসে। তার পর থেকে টানা তিন বছর ধরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতের এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি কমেছে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৯৭ ও ২৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি খোলা আরো ৩০ দশমিক ১০ শতাংশ কমেছে। আর এ সময়ে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ২৫ দশমিক ২২ শতাংশ। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলা হয়েছে ১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের। একই সময়ে এ খাতের ১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে।

বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখিতা ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি অস্বাভাবিক হারে কমে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বিগ্ন ব্যাংক নির্বাহীরাও। এ বিষয়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিও কমেছে ৩০ শতাংশের বেশি। দেশের অর্থনীতির জন্য এ দুটি সংবাদই উদ্বেগের। অর্থনীতিকে ইতিবাচক ধারায় ফিরিয়ে আনতে হলে দুটি ক্ষেত্রেই বড় প্রবৃদ্ধি আনতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কয়েক বছর ধরেই কমে আসছিল। মুদ্রানীতিতে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছিল, সেটি অর্জন হচ্ছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না। সবাই সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ ও নির্বাচনের দিকে নজর রাখছে।’

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের বড় অংশই বেসরকারি খাতনির্ভর। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বেসরকারি খাত সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে। ২০১৯ সাল-পরবর্তী সময় থেকে এ সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। কভিড-সৃষ্ট দুর্যোগে দেশের উদ্যোক্তাদের বড় অংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই দেশে তীব্র ডলার সংকট দেখা দেয়। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে ঋণের সুদহার ও মূল্যস্ফীতি। তিন বছর ধরে দেশের মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১১ শতাংশে ঘুরপাক খাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নীতি সুদহার (রেপো রেট) ৫ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়ে প্রায় ১৫ শতাংশে ঠেকে। দেশে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে এতটা ভাটা নেমে আসার পেছনে উচ্চ সুদহারকেও দায়ী করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। সুদহার বৃদ্ধি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিদ্যমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ব্যাংক খাত থেকে ঋণের নামে অর্থ লোপাট বন্ধ হয়েছে। তবে তারল্য সংকটের কারণে অন্তত দুই ডজন ব্যাংক বিনিয়োগের সক্ষমতা হারিয়েছে। এসব কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এতটা কমে এসেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে ব্যাংক ঋণের সুদহার এখন ১৫ শতাংশের বেশি। এত সুদ দিয়ে এখানে বিনিয়োগ করবে কে! সরকার বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে আসার জন্য চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজিত হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, বিদেশীরা তখনই বিনিয়োগ করে, যখন স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসেন। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা এখন নানা কারণে বিনিয়োগ করতে চাচ্ছেন না। আমরা যদি না করি, তাহলে বিদেশীরাও আগ্রহী হবে না।’

বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি, কর্মসংস্থান, বেকারত্বসহ অর্থনীতির নানা দিক পর্যালোচনা করে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। ‘‌বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শিরোনামে প্রকাশ করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) দেশের শ্রমশক্তির ৪ শতাংশ চাকরি হারিয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে মজুরি না বেড়ে উল্টো কমেছে। এর মধ্যে স্বল্প দক্ষ শ্রমিকদের মজুরি কমেছে ২ শতাংশ হারে। আর উচ্চপর্যায়ের কর্মীদের মজুরিও দশমিক ৫ শতাংশ হারে কমেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আয়ের উৎস সংকুচিত হওয়ায় চলতি বছর নতুন করে ৩০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে বলেও বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ হলো, গত দুই বছর শ্রমবাজারের অবনতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে সৃষ্ট অর্থনৈতিক নাজুক পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রতি পাঁচটি পরিবারের মধ্যে অন্তত তিনটি তাদের সঞ্চয় ভেঙে জীবিকা নির্বাহ করেছে। তবে এক্ষেত্রে প্রবাসী আয় আসা পরিবারগুলো অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। দেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হতে না পারায় প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ১০ লাখ মানুষ অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যাচ্ছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ নীতিতে চলছেন বলে জানান মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নানা ধরনের সংকট ও অস্থিরতা চলছে। এখনো মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি। ব্যাংক ঋণের সুদহারও অনেক উচ্চ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বিনিয়োগের অনুকূলে নেই। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা ওয়েট অ্যান্ড সি নীতিতে চলছেন।’

কামরান টি রহমান আরো বলেন, ‘বিভিন্ন শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে যেসব শ্রমিক বেকার হয়েছেন, তারা এখনো চাকরি পাননি। মুখে বলা যত সহজ, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি ততটা সহজ নয়। যত তাড়াতাড়ি দেশে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে, বিনিয়োগ পরিস্থিতিরও তত দ্রুত উন্নতি হবে।’

আরও